পরিশ্রমে ধন আনে ,কঠোর পরিশ্রম করেও এদের ভাগ্যের চাকা ঘুরেনি

মহিউদ্দিন আহমেদ,গাজীপুর প্রতিনিধি: পরিশ্রমে ধন আনে, পুণ্যে আনে সুখ। আলস্যে দারিদ্রতা আনে, পাপে আনে দুঃখ।” একজন মানুষকে কর্মক্ষম করে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে জনপ্রিয় এই খনার বচনটি নানাভাবে অর্থবহন করে আসলেও কিছু কিছু জায়গায় এর সঙ্গে রয়েছে বাস্তবতার অনেক অমিল। এ রকম দৃষ্টান্তের দেখা মিললো কাঠ শ্রমিকদের পেশায়। নানা পেশার ভীরে কাঠ বহনকারী এই শ্রমিকরা যুগের পর যুগ ধরে তিল তিল করে নিজের জীবনটাই শ্রমের মাধ্যমে বিকিয়ে দিয়েও ভাগ্যের চাকা ঘোরাতে পারেনি। আজীবন দুঃখ, কষ্টকে সঙ্গী করেই তারা এখন প্রায় পৌঁছে গেছেন জীবনের শেষাংশে।গাজীপুরের শ্রীপুরের শীতলক্ষ্যা ঘেঁষা বরমী বাজারে এমন কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে জীবন ও জীবিকা চালানো শ্রমিকদের মুখে এখন শুধুই জীবনে না পাওয়ার বেদনার গান। চেহারায় মলিনতা, কঙ্কালসার দেহের এই মানবদের প্রত্যেকের বয়স এখন প্রায় সত্তোরের কাছাকাছি। এসব শ্রমিকরা কঠোর পরিশ্রমকে পুঁজি করে বিশালাকার বৃক্ষের ভার বহন করলেও জীবনের ভার বহন করা হয়ে উঠছে তাদের জন্য দুঃসাধ্য।বরমী বাজারের কাঠ ব্যবসায়ীদের তথ্য মতে, ময়মনসিংহ, কিশোরগঞ্জ ও গাজীপুর জেলার অধিকাংশ কাঠ ব্যবসা শীতলক্ষ্যা নদীকে কেন্দ্র করে পরিচালিত হয়। আর ব্রিটিশ শাসনামল থেকেই নদীর তীর ঘেঁষা বরমী বাজার ব্যবসা বাণিজ্যের কেন্দ্র হিসেবে ব্যাপক পরিচিত। এ সময় বাজারের একটি অংশ নিয়ে গড়ে উঠে কাঠমহল। যেখানে প্রতিদিন প্রায় শতাধিক শ্রমজীবী মানুষ শ্রম বিকিয়ে থাকেন। তবে এই বাজারের কাঠমহলকে কেন্দ্র করে সবার মধ্যে আলোচনায় রয়েছেন অমানবিক পরিশ্রম করা এসব কাঠ শ্রমিকরা।
বরমী বাজার কাঠ ব্যবসায়ী সমিতির সাবেক সভাপতি রফিকুল ইসলাম ইজদান জানান, এই কাঠ শ্রমিকরা কঠোর পরিশ্রম করে থাকেন। তারা নদী থেকে কাঠ কাঁধে করে ডাঙ্গায় তোলে। আবার এক স্থান থেকে অন্য স্থানে কাঁধে করে পরিবহন করে থাকে। বর্তমান সভ্যতায় নানা জায়গায় প্রযুক্তির ব্যবহার হলেও এই পেশায় নেই কোন আধুনিকতার ছোঁয়া। এখানে শুধু কায়িক শ্রমকেই ব্যবহার করা হয়। স্বাধীনতার পর বরমী বাজারে ৬০ জন শ্রমিক এ পেশায় নিয়োজিত থাকলেও পরিশ্রমের কাছে পরাজিত হয়ে অনেকেই বিদায় নিয়েছেন এই পেশা থেকে। বর্তমানে কর্মরত আছেন মাত্র ১২জন।
নান্দিয়া সাঙ্গুন গ্রামের জমিস উদ্দিন জীবন কাটিয়ে দিয়েছেন কাঁধে ভার বহন করে। তাই কাঁধের একটি অংশ পশুর ঘাড়ের মত হয়ে গেছে তার। নিজের ওজন ৫৫ কেজি থাকার পরও তাকে বহন করতে হয় শত কেজির ওপরের ভার। সারাদিন কঠোর পরিশ্রম করে কাজ থাকলে মাইনে মেলে ২০০-৩০০ টাকা। আর কাজ না থাকলে শূণ্য হাতেই বাড়ি ফেরেন। একটি সময় দেশের মানুষের জীবনমান নিম্নতম অবস্থানে থাকায় তখন এ পেশায় দিন কোনমতে চলতো। এখন মানুষের জীবনের মান উন্নত হয়েছে সকল তৈজষপত্রের দামও আকাশ ছোঁয়া, বেড়েছে খাদ্যের দামও। তবে শুধু বাড়েনি এ পেশার মান। কঠোর পরিশ্রম করেও মেলে ন্যূনতম মুজুরী তাই এখন অনেকটা হতাশার মধ্যেই দিনগুলো চলছে।হরতকি গ্রামের আব্দুল খালেক বয়সের ভারে নুহ্য হয়ে পড়ছেন। তবে এখনও তাকে কঠোর পরিশ্রম করতে হয়। কেননা এ কাজে না আসলে তার যে চুলা জ্বলে না। সম্পদ বলতে আছে বাপ-দাদার রেখে যাওয়া দেড় শতক জমি। দুই ছেলে-মেয়ে তার। অভাবের কারণে তাদেরও লেখাপড়া করাতে পারেননি।
সোহাদিয়া গ্রামের মজিবুর রহমান জানান, আমাদের এ পেশার লোকেরা কঠোর পরিশ্রম করার পরও দারিদ্রতার অভিশাপমুক্ত হতে পারেনি। এছাড়াও এসব শ্রমিকদের সামনে আর কোন পথ খোলা না থাকায় তারা এখনও বেঁচে থাকার তাগিদে কঠোর পরিশ্রম করেন। আমাদের দেখার যেন কেউ নেই।
বরমী বাজার বণিক সমিতির সভাপতি অহিদুল হক ভূঁইয়া জানান, এ যুগেও এ ধরনের কঠোর পরিশ্রম মানুষকে মানায় না। কেননা মানব শরীর বলে কথা। কঠোর পরিশ্রমের এ কাজ করতে গিয়ে অনেকেই অসুস্থ্য হয়ে পরেন। তারপরও তারা জীবিকা চালাতে এ ধরনের কাজ করে যাচ্ছে্ন। তাদেরকে যদি সহায়তা দেয়া যায় তাহলে হয়তো জীবনের শেষাংসে একটু আলো দেখতে পারেন।
বরমী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শামসুল হক বাদল সরকার জানান, যুগের পর যুগ ধরে কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে এরা জীবন ও জীবিকা চালালেও বর্তমানে তাদের অবস্থান চরম দারিদ্র সীমার নীচে। তাদেরকে যদি সরকারের সামাজিক কর্মসূচির আওতায় আনা হয়, তাহলে হয়তো তারা কিছুটা উপকৃত হবেন।শ্রীপুর উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মঞ্জুরুল ইসলাম জানান, দরিদ্র এই জীবন সংগ্রামী কাঠ শ্রমিকদের পাশে থাকার জন্য সরকার বদ্ধপরিকর। বরমীর দরিদ্র পরিবারের এই শ্রমিকদের সরকারের সামাজিক কর্মসূচির আওতায় আনা হবে।


দেশজুড়ে