গাজীপুরে পোল্ট্রি বর্জ্যে পরিবেশ বিপন্ন

মহিউদ্দিন আহমেদ,গাজীপুর প্রতিনিধি: গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলা কারখানার অনিয়ন্ত্রিত দূষিত বর্জ্য বিস্তীর্ণ এলাকার পরিবেশ দূষিত করছে বলে অভিযোগ গ্রামবাসীর। গ্রামে মানুষের জীবিন জীবিকা হুমকি ও গোখাদ্যের সংকট দেখা দিয়েছে। উপজেলার কেন্দুয়াবো, আমুরি, আদিয়াবো, উজুলী, আদিয়ারচালা, কপালেশ্বর গ্রামে এর প্রভাব দেখা দিয়েছে।গ্রামগুলোর শত শত একর কৃষি জমি বছরের পর আনাবাদি থাকছে। খাবারে মাছির উপদ্রব হচ্ছে। ওইসব এলাকার লোকজন নাকে রুমাল চেপে পথ চলেন। অনিয়ন্ত্রিত দূষিত বর্জ্যে পরিবেশ দূষনের ফলে আবাদি জমিগুলো বিষাক্ত হয়ে উঠেছে। ওইসব জমিতে জলজ প্রাণী কমে যাচ্ছে। ফসল ফলাতে না পেরে কৃষকেরা বছরের পর বছর লোকসান গুণছেন। শিক্ষার্থীরা শ্রেণীকক্ষে দুর্গন্ধের মধ্যে পড়াশুনায় অংশগ্রহণ করছে।

ডায়মন্ড এগ লিমিটেড ও প্রোটিন হাউজ নামে দুটি মুরগীর খাদ্য, বাচ্চা ও ডিম উৎপাদনকারী কারখানার দূষিত বর্জ্যে পরিবেশ দূষণের এ অভিযোগ পাওয়া গেছে।কাপাসিয়ার কেন্দুয়াবো, বড়চালা, আমুরি, আদিয়াবো, বীর উজুলী, আদিয়ারচালা, কপালেশ্বর গ্রামের কৃষকেরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন সবচেয়ে বেশি। অনেকে বসতভিটা ছেড়ে অন্যত্র পাড়ি জমিয়েছেন। গ্রামবাসী নানা জায়গায় অভিযোগ করেও কোনো প্রতিকার পাচ্ছেন না। ডায়মন্ড এগ লিমিটেড কাপাসিয়ার কেন্দুয়াবো গ্রামে এবং প্রোটিন হাউজ লিমিটেড কারখানাটি কপালেশ্বর এলাকায় অবস্থিত।
সরেজমিন ওইসব এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, আবাদি জমিগুলোর পানির ওপর বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে মুরগীর বর্জ্যের কালো স্তর পড়ে রয়েছে। ময়লা থেকে বুদ বুদ উঠছে। দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে চারদিকে।

কেন্দুয়াবো গ্রামের রাজু মিয়ার স্ত্রী সাজেদা বেগম বলেন, ডায়মন্ড এগ লিমিটেড’র লোকজন মৃত মুরগী ও মুরগীর বিপুল পরিমাণ বর্জ্য বাড়ির পাশে উম্মুক্ত স্থানে ফেলে রেখে যায়। মাছির জন্য দরজা জানালা বন্ধ করে খাবার খেতে হয়। জোরপূর্বক জমি কেনার উদ্দেশে এমন আচরণ করে থাকে। এসব জমিতে লাখ লাখ মণ ধান উৎপাদন হতো। জমিতে পোল্ট্রি বর্জ্য ফেলার কারণে এখন ধান উৎপাদন হয় না। বেশ কয়েকবার ধান লাগিয়ে ফলন পাওয়া যায়নি। এক মাস বয়সেই ধান গাছ মরে যায়।বাড়ির পাশে পরিবেশ দূষণের কারণে তার ছোট ভাই আব্দুস ছাত্তার বাধ্য হয়ে স্বপরিবারে বাড়ি ছেড়ে পাশের এলাকায় টিনের ছাপড়া ঘর তৈরী করে বসবাস করছেন।একই গ্রামের কৃষক সুরুজ মিয়া বলেন, সোমবার সকাল আটটায় জাল দিয়ে ডোবায় মাছ ধরতে আসি। দুপুর দুইটা পর্যন্ত ছোট ছোট আমুনানিক ১৫টি পুঁটি মাছ পেয়েছি। আগে ধানের জমিতে জমে থাকা পানিতে মাছে জাল ভরে ধরতাম। এখন কিনে খাওয়ারও সুযোগ নেই।কেন্দুয়াবো সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ইমরান, শাহ পরান, মিনহাজ জানায়, বাড়িতে বসেও দুর্গন্ধ, রাস্তা দিয়ে বিদ্যালয়ে যেতেও দুর্গন্ধ, বিদ্যালয়ে যতক্ষণ থাকি তখনও দুর্গন্ধ। আমাদের বেঁচে থাকাটা এখন অনেক কষ্টের।কেন্দুয়াবো সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আলমগীর হোসেন বলেন, কারখানার বর্জ্য পরিবহনের সময় গাড়ী থেকে পুরো রাস্তায় পরে সয়লাব হয়ে যায়। যতদূর যায় ততদূর দূর্গন্ধ ছড়াতে থাকে। দূর্গন্ধের কারণে শ্রেণীকক্ষে পঠন পাঠনে বিঘ্ন ঘটে। কোমলমতি শিক্ষার্থীরাও দুর্ভোগের সময় অতিবাহিত করে।কেন্দুয়াবো গ্রামের আব্দুস সোবাহানের ছেলে কৃষক চাঁন মিয়া বলেন, বাড়ির আশপাশে গ্রামের ডোবা নালার সকল পানি নোংরা হয়ে গেছে। গত তিন বছর যাবত এসব পানিতে মাছ পাওয়া যায় না। ফসল হয় না। কান্নাকন্ঠে তিনি বলেন, এবার ৮ বিঘা জমিতে বর্গা চাষ করেছিলাম। ধানের চারা, সার, পানি সব মিলিয়ে ৬৫ হাজার টাকা খরচ করেছি। একটি ধানও পাইনি। ধান গাছ মরে যাওয়ায় ফসল হয়নি। জমির মালিকেরা একটি টাকাও দেয়নি। ধান ক্ষেতে ছেড়ে দেয়া মুরগীর বর্জ্য আমার সব নষ্ট করে দিয়েছে।ছুরত আলীর ছেলে কৃষক আমিনুল হক বলেন, মুরগীর বর্জ্যে গবাদিপশুর খড়ও সংগ্রহ করতে পারিনি। গরু চড়ানোর কোনো জায়গাও গ্রামে এখন অবশিষ্ট নেই। আমার মতো সকল কৃষক গবাদিপশুর খাদ্য সংকটে ভুগছেন। ডায়মন্ড ও প্রেটিন হাউজের লেদা (মুরগীর বর্জ্য) ধান ক্ষেতের খুব ক্ষতি করে।আমুরি এলাকার চাঁন মিয়ার স্ত্রী পেয়ারা বেগম বলেন, আমরাইদ বাজারের গ্রামীণ ব্যাংক থেকে ৫০ হাজার, ব্র্যাক ব্যাংক থেকে ৫০ হাজার টাকা ঋণ ও নিজের জমানো আরও ৫০ হাজার টাকা দিয়ে আট বিঘা বর্গা জমির খরচ চালিয়েছি। আজকে এই পোল্ট্রির জন্য এই দারা (ধানের নিচু জমি) থেকে দেড় লাখ টাকা মাইর খেয়েছি। আমি ধান চাষ করে এখন ভিখারী হয়ে ঘুরি। পরিবার পরিজন নিয়ে খেয়ে না খেয়ে দিনাতিপাত করছি। প্রোটিন হাউজের দূষিত বর্জ্যে বাড়িতেও থাকতে পারিনা। পরিবেশ বিষাক্ত হয়ে উঠেছে।

কপালেশ্বর গ্রামের কামাল হোসেন বলেন, কারখানার বর্জ্য প্রকাশ্যে বা রাতের আাঁধারে বিভিন্ন কৃষকের জমিতে ফেলা হয়। পরে জমিগুলো কারখানা কর্তৃপক্ষের কাছে বিক্রি করতে বাধ্য করা হয়। এলাকার পেশীশক্তিধর লোকজন তাদের সাথে থাকেন।
স্থানীয় স্বাস্থ্য কর্মীরা জানান, ডায়মন্ড

পোল্ট্রি ও প্রেটিন হাউজের অনিয়ন্ত্রিত বর্জ্য নিষ্কাশনের ফলে মানুষের জ্বর, ঠান্ডা, শ্বাসকষ্ট লেগেই রয়েছে। প্রায় প্রতি বাড়িতে শিশু, যুবক, বৃদ্ধ বয়সের এরকম রোগী পাওয়া যাচ্ছে। গবাদিপশুও ভাইরাসজনিত নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে।ক্ষতিগ্রস্ত খলিলুর রমানের ছেলে মো. আশরাফুল বলেন, গত বছর ডায়মন্ড ও প্রোটিন হাউজ কর্তৃপক্ষ ক্ষতিপূরণ দেয়ার কথা বলে কমপক্ষে ৫০জন কৃষকের কাছ থেকে স্বাক্ষর নিয়ে আর আসেনি। অনিয়ন্ত্রিত দূষিত বর্জ্য শুধু প্রাকৃতিক পরিবেশ নষ্ট করছে না মানবদেহ জ্বালিয়ে দিচ্ছে।গাজীপুর পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিদর্শক শেখ মোজাহিদ জানান, এলাকাবাসীর অভিযোগের প্রেক্ষিতে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে পরিবেশ দূষণের সত্যতা পাওয়া গেছে। কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের প্রস্তুতি চলছে। আমরা এ ব্যাপারে একটি প্রতিবেদন তৈরী করে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য ঢাকা অফিসে পাঠিয়ে দেব।


অন্যান্য