কারা হেফাজতে পলাশের মৃত্যুকে হত্যাকা- বলছে হিন্দু মহাজোট

মোঃ বাবুল হোসেন, পঞ্চগড় জেলা প্রতিনিধি: পঞ্চগড় কারাগারের ভেতর অগ্নিদগ্ধ আইনজীবী পলাশ কুমার রায়ের মৃত্যুর ঘটনাকে হত্যাকা- বলছে জাতীয় হিন্দু মহাজোট। ঘটনার প্রতিবাদে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেছে বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু মহাজোট পঞ্চগড় জেলা শাখা। আজ শুক্রবার সকালে পঞ্চগড় জেলা শহরের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের সামনে পঞ্চগড়-ঢাকা মহাসড়কে এই কর্মসূচি পালন করা হয়। কর্মসূচিতে পলাশের পরিবার, হিন্দু ধর্মীয় বিভিন্ন সংগঠন ছাড়াও বিভিন্ন সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতাকর্মীরা অংশ নেন। ঘণ্টাব্যাপী মানববন্ধনে বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু মহাজোট পঞ্চগড় জেলার সভাপতি পরিমল চন্দ্র বর্ম্মন, নিহত পলাশের মা মীরা রানী রায়, জেলা উদীচী সভাপতি সফিকুল ইসলাম, পঞ্চগড় নাগরিক কমিটির সাধারণ সম্পাদক এরশাদ হোসেন সরকার, পঞ্চগড় প্রেস ক্লাব সভাপতি সফিকুল আলম, হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ নেতা সুবাস চন্দ্র, অর্জুন কুমার ভৌমিকসহ সনাতন ধর্মালম্বী বিভিন্ন সংগঠনের নেতারা বক্তব্য দেন। এ সময় পলাশের পরিবার ও বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু মহাজোটের পক্ষ থেকে কারাগার অভ্যন্তরে অগ্নিদগ্ধ হয়ে মৃত্যুর ঘটনাকে হত্যাকা- দাবি করা হয়েছে। এ ঘটনা সুষ্ঠু তদন্ত করে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করা হয়। পলাশের মা মীরা রাণী রায় বলেন, ২০১৩ সালে কোহিনুর কেমিক্যাল কম্পানিতে আইন কর্মকর্তা হিসেবে যোগ দেন পলাশ। সেখানে তাকে অবৈধ কাজ করতে বলা হলে পলাশ তাতে রাজি হয়নি। কম্পানি থেকে তাকে গালিগালাজ করা হয়। তাই সে চাকরি ছেড়ে দেয়। পরে তার বিরুদ্ধে মিথ্যা অর্থ আত্মসাতের মামলা করা হয়। ওই মামলা প্রত্যাহারের দাবিতে পলাশ গত ২৫ মার্চ পঞ্চগড়ে মানববন্ধন করলে তার বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে কটূক্তি করার একটি মামলা করে জেল হাজতে পাঠানো হয়। মীরা রাণী আরো বলেন, ‘আমরা মুক্তিযোদ্ধা পরিবার। আমার ছেলেকে জেলের ভেতর কে আগুন দিল আমরা জানি না। আমার ছেলের পুরো শরীর পুড়ে গেছে। আমি প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমার ছেলে হত্যার বিচার চাই।’ জেলা নাগরিক কমিটির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট এরশাদ হোসেন সরকার বলেন, কারাগারের ভেতর অগ্নিদগ্ধ হওয়ার বিষয়টি নিশ্চয়ই সন্দেহের। বিষয়টি আমাদের কাছে স্পষ্ট করা হোক। জেলা উদীচী সভাপতি সফিকুল ইসলাম বলেন, আমরা জানি না এটা হত্যা নাকি আত্মহত্যা। তবে আমাদের অধিকার রয়েছে এর সুষ্ঠু তদন্তের দাবি করার। পঞ্চগড় হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ নেতা সুভাষ চন্দ্র রায় বলেন, কারাগারে মানুষ নিরাপদ না হলে পৃথিবীর আর কোথাও নিরাপদ থাকার প্রশ্নই আসে না। পঞ্চগড় হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ নেতা অর্জুন কুমার ভৌমিক বলেন, বিচার বিভাগীয় তদন্ত শুরু হয়েছে। আমরা আশাবাদী সুষ্ঠু তদন্তই হবে। তবে আমরা চাই সেই তদন্ত প্রতিবেদন যেন জনসমক্ষে তুলে ধরা হয়। জাতীয় হিন্দু মহাজোটের পঞ্চগড় জেলা শাখার আহ্বায়ক পরিমল চন্দ্র রায় বলেন, পলাশ সব সময় ন্যায় পথে ছিলেন এবং ন্যায়ের পক্ষে কথা বলতেন। কারাগারের ভেতরে তার অগ্নিদগ্ধ হওয়ার বিষয়টি আমরা মেনে নিতে পারছি না। আমরা মনে করছি এটি পরিকল্পিত হত্যাকা-। তাই এর সঙ্গে যারা জড়িত তাদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করছি। অন্যথায় আরো কঠোর আন্দোলন গড়ে তোলা হবে। আইনজীবী পলাশের বাড়ি আটোয়ারী উপজেলার বড়শিংগিয়া এলাকায়। সে আটোয়ারী উপজেলার সাবেক মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান মীরা রাণী রায়ের ছেলে। স¤প্রতি অনুষ্ঠিত উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে নিজেও ভাইস চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে পরাজিত হন পলাশ। বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু ছাত্র মহাজোটের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক ছিলেন তিনি। গত ২৫ মার্চ পলাশ দুপুরে পঞ্চগড় জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের সামনে পলাশের বিরুদ্ধে কোহিনুর কেমিক্যাল কম্পানির করা প্রায় ৩১ লাখ টাকা আত্মসাতের মামলা প্রত্যাহার দাবিতে পরিবারের লোকজন নিয়ে অনশন শুরু করেন। পরে সেখান থেকে উঠে পঞ্চগড় শের-ই-বাংলা পার্কসংলগ্ন মহাসড়কে এসে মানববন্ধন শুরু করেন তাঁরা। একপর্যায়ে রাস্তা বন্ধ করে হ্যান্ডমাইকের সাহায্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নামে কটূক্তি করেন বলে অভিযোগ করা হয় পলাশের বিরুদ্ধে। স্থানীয় কিছু লোক তাঁকে আটক করে পঞ্চগড় সদর থানা পুলিশের কাছে তুলে দেয়। বিকেলে প্রধানমন্ত্রীকে কটূক্তি করার অভিযোগ এনে পঞ্চগড় জেলা শহরের ধাক্কামারা এলাকার রাজিব রানা নামের এক যুবক পলাশের বিরুদ্ধে পঞ্চগড় সদর থানায় মামলা করেন। ওই মামলায় পরদিন তাকে আদালতের মাধ্যমে জেল হাজতে পাঠানো হয়। ২৮ এপ্রিল ঢাকার একটি আদালতে কোহিনূর ক্যামিক্যালের করা টাকা আত্মসাতের মামলার পলাশকে উপস্থিত করার কথা ছিল। এর আগেই পলাশকে জেলের অভ্যন্তরেই শরীরে অগ্নিদগ্ধ অবস্থায় গত ২৬ এপ্রিল উদ্ধার করে প্রথমে পঞ্চগড় আধুনিক সদর হাসপাতাল ও পরে রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। শরীরের ৪৭ শতাংশ পুড়ে যাওয়ায় রংপুর মেডিক্যাল কলেজ থেকে পরদিন উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে ভর্তি করা হয় তাকে। গত ৩০ এপ্রিল দুপুরে সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায় পলাশ। কারাগারের অভ্যন্তরে অগ্নিদগ্ধ হওয়ার ঘটনায় বিষয়টি নিয়ে বেশ তোলপাড় শুরু হয়। এরই মধ্যে বেশ কয়েকটি তদন্তসহ উচ্চ আদালতের নির্দেশে বিচার বিভাগীয় তদন্তও শুরু হয়েছে।


দেশজুড়ে